গীতাঞ্জলি (কাব্যগ্রন্থ)

by

1

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণধুলার তলে ।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে ।
নিজেরে করিতে গৌরব দান
নিজেরে কেবলই করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে ।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে ।

আমারে না যেন করি প্রচার
আমার আপন কাজে ;
তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ
আমার জীবন-মাঝে ।
যাচি হে তোমার চরম শান্তি
পরানে তোমার পরম কান্তি
আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও
হৃদয়পদ্মদলে ।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে ।

2

আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই,
বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।
এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর
জীবন ভ’রে।
না চাহিতে মোরে যা করেছ দান
আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ,
দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায়
সে মহাদানেরই যোগ্য করে
অতি-ইচ্ছার সংকট হতে
বাঁচায়ে মোরে।
আমি কখনো বা ভুলি, কখনো বা চলি
তোমার পথের লক্ষ্য ধরে-
তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে
যাও যে সরে।
এ যে তব দয়া জানি হায়,
নিতে চাও ব’লে ফিরাও আমায়,
পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন
তব মিলনেরই যোগ্য করে
আধা- ইচ্ছার সংকট হতে
বাঁচায়ে মোরে

3

কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘরে দিলে ঠাঁই-
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।
পুরনো আবাস ছেড়ে যাই যবে
মনে ভেবে মরি কী জানি কী হবে,
নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন
সে কথা যে ভুলে যাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।

জীবনে মরণে নিখিল ভুবনে
যখনি যেখানে লবে,
চির জনমের পরিচিত ওহে,
তুমিই চিনাবে সবে।
তোমারে জানিলে নাহি কেহ পর,
নাহি কোন মানা, নাহি কোন ডর,
সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ-
দেখা যেন সদা পাই।
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।

4

বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে
নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।
সহায় মোর না যদি জুটে
নিজের বল না যেন টুটে,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি
লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
এ নহে মোর প্রার্থনা,
তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
আমার ভার লাঘব করি
নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়।
নম্রশিরে সুখের দিনে
তোমারি মুখ লইব চিনে,
দুখের রাতে নিখিল ধরা
যেদিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়।

5

অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো,
সুন্দর কর হে।
জাগ্রত করো, উদ্যত করো,
নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নরলস নিঃসংশয় করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো,
অন্তরতর হে।

যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে,
মুক্ত করো হে বন্ধ,
সঞ্চার করো সকল মর্মে
শান্ত তোমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত করো হে,
নন্দিত করো, নন্দিত করো,
নন্দিত করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।

6

প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে
প্লাবিত করিয়া নিখিল দ্যুলোক-ভূলোকে
তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া ।
দিকে দিকে আজি টুটিয়া সকল বন্ধ
মুরতি ধরিয়া জাগিয়া উঠে আনন্দ ;
জীবন উঠিল নিবিড় সুধায় ভরিয়া ।

চেতনা আমার কল্যাণ-রস-সরসে
শতদল-সম ফুটিল পরম হরষে
সব মধু তার চরণে তোমার ধরিয়া ।
নীরব আলোকে জাগিল হৃদয়প্রান্তে
উদার উষার উদয়-অরুণ কান্তি,
অলস আঁখির আবরণ গেল সরিয়া ।

7

তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে ।
এসো গন্ধে বরনে , এসো গানে ।
এসো অঙ্গে পুলকময় পরশে ,
এসো চিত্তে অমৃতময় হরষে ,
এসো মুগ্ধ মুদিত দু নয়ানে ।
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে ।

এসো নির্মল উজ্জ্বল কান্ত ,
এসো সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত ,
এসো এসো হে বিচিত্র বিধানে ।
এসো দুঃখে সুখে , এসো মর্মে ,
এসো নিত্য নিত্য সব কর্মে ;
এসো সকল-কর্ম-অবসানে ।
তুমি নব নব রূপে এসো প্রাণে ।

8

আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়
লুকোচুরির খেলা।
নীল আকাশে কে ভাসালে
সাদা মেঘের ভেলা।
আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে,
উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে,
আজ কিসের তরে নদীর চরে
চখাচখির মেলা।

ওরে যাবো না আজ ঘরে রে ভাই,
যাবো না আজ ঘরে!
ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ
নেব রে লুঠ করে।
যেন জোয়ার জলে ফেনার রাশি
বাতাসে আজ ফুটেছে হাসি,
আজ বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশি
কাটবে সারা বেলা।

9

আনন্দেরই সাগর থেকে
এসেছে আজ বান ।
দাঁড় ধরে আজ বোস্ রে সবাই
টান রে সবাই টান্ ।
বোঝা যতই বোঝাই করি
করব রে পার দুখের তরী,
ঢেউয়ের ‘পরে ধরব পাড়ি
যায় যদি যাক প্রাণ ।
আনন্দেরই সাগর থেকে
এসেছে আজ বান ।

কে ডাকে রে পিছন হতে,
কে করে রে মানা,
ভয়ের কথা কে বলে আজ —
ভয় আছে সব জানা ।
কোন্ শাপে কোন্ গ্রহের দোষে
সুখের ডাঙায় থাকব বসে;
পালের রশি ধরবো কষি,
চলব গেয়ে গান ।
আনন্দেরই সাগর থেকে
এসেছে আজ বান ।

10

তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ
দুখের অশ্রুধার।
জননী গো, গাঁথব তোমার
গলার মুক্তাহার।
চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে
মালা হয়ে জড়িয়ে আছে,
তোমার বুকে শোভা পাবে আমার
দুখের অলঙ্কার॥

ধন ধান্য তোমারি ধন,
কী করবে তা কও।
দিতে চাও তো দিয়ো আমায়,
নিতে চাও তো লও।
দুঃখ আমার ঘরের জিনিস,
খাঁটি রতন তুই তো চিনিস–
তোর প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস
এ মোর অহংকার॥

11

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা
গেঁথেছি শেফালিমালা ।
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে
সাজিয়ে এনেছি ডালা ।
এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার
শুভ্র মেঘের রথে,
এসো নির্মল নীল পথে,
এসো ধৌত শ্যামল
আলো-ঝলমল
বনগিরিপর্বতে ।
এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদল
শীতল-শিশির-ঢালা ।

ঝরা মালতীর ফুলে
আসন বিছানো নিভৃত কুঞ্জে
ভরা গঙ্গার কূলে
ফিরিছে মরাল ডানা পাতিবারে
তোমার চরণমূলে ।

গুঞ্জরতান তুলিয়ো তোমার
সোনার বীণার তারে
মৃদু মধু ঝংকারে,
হাসিঢালা সুর গলিয়া পড়িবে
ক্ষণিক অশ্রুধারে ।
রহিয়া রহিয়া যে পরশমণি
ঝলকে অলককোণে,
পলকের তরে সকরুণ করে
বুলায়ো বুলায়ো মনে —
সোনা হয়ে যাবে সকল ভাবনা,
আঁধার হইবে আলা ।

12

অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া —
দেখি নাই কভু দেখি নাই এমন তরণী বাওয়া ।।
কোন্‌ সাগরের পার হতে আনে কোন্‌ সুদুরের ধন —
ভেসে যেতে চায় মন,
ফেলে যেতে চায় এই কিনারায় সব চাওয়া সব পাওয়া ।।

পিছনে ঝরিছে ঝরো ঝরো জল, গুরু গুরু দেয়া ডাকে,
মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে ।
ওগো কাণ্ডারী, কে গো তুমি, কার হাসিকান্নার ধন
ভেবে মরে মোর মন —
কোন সুরে আজ বাঁধিব যন্ত্র, কী মন্ত্র হবে গাওয়া ।।

রচনা: শান্তিনিকেতন, ৩ ভাদ্র ১৩১৫
গীতবিতান, বিশ্বভারতী ১৩৮০ সং পৃ ৪৮৩ থেকে সংগৃহীত ।

পাঠান্তর:
গীতাঞ্জলিতে (রবীন্দ্র রচনাবলী, বিশ্বভারতী ১৩৮৯, খণ্ড ১১, পৃ ১৩):
– পঙ্‌ক্তি ১: ছিল: “লেগেছে অমল ধবল পালে / মন্দ মধুর হাওয়া”
– পঙ্‌ক্তি ৭: “ঝরো ঝরো” ছিল: “ঝর ঝর”
পঙ্‌ক্তিবিন্যাস এবং যতিচিহ্নেও তারতম্য আছে।

13

আমার নয়ন-ভুলানো এলে ।
আমি কী হেরিলাম হৃদয় মেলে ।
শিউলিতলার পাশে পাশে
ঝরা ফুলের রাশে রাশে
শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে
অরুণরাঙা চরণ ফেলে
নয়ন-ভুলানো এলে ।

আলোছায়ার আঁচলখানি
লুটিয়ে পড়ে বনে বনে,
ফুলগুলি ওই মুখে চেয়ে
কী কথা কয় মনে মনে ।
তোমায় মোরা করব বরণ,
মুখের ঢাকা করো হরণ,
ওইটুকু ওই মেঘাবরণ
দু হাত দিয়ে ফেলো ঠেলে।
নয়ন-ভুলানো এলে ।

বনদেবীর দ্বারে দ্বারে
শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,
আকাশবীণার তারে তারে
জাগে তোমার আগমনী ।
কোথায় সোনার নূপুর বাজে,
বুঝি আমার হিয়ার মাঝে,
সকল ভাবে সকল কাজে
পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে–
নয়ন-ভুলানো এলে ।

রচনা: শান্তিনিকেতন, ৭ ভাদ্র ১৩১৫
রবীন্দ্র রচনাবলী (বিশ্বভারতী ১৩৮৯) খণ্ড ১১, পৃ ১৪ থেকে সংগৃহীত ।

14

জননী, তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে ।
জননী , তোমার মরণহরণ বাণী
নীরব গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে ।
তোমারে নমি হে সকল ভুবন-মাঝে ,
তনু মন ধন করি নিবেদন আজি
ভক্তিপাবন তোমার পূজার ধূপে ।
জননী , তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে ।

15

জগৎ জুড়ে উদার সুরে
আনন্দগান বাজে ,
সে গান কবে গভীর রবে
বাজিবে হিয়া-মাঝে ।
বাতাস জল আকাশ আলো
সবারে কবে বাসিব ভালো ,
হৃদয়সভা জুড়িয়া তারা
বসিবে নানা সাজে ।
নয়নদুটি মেলিলে কবে
পরান হবে খুশি ,
যে পথ দিয়া চলিয়া যাব
সবারে যাব তুষি ।
রয়েছ তুমি , এ কথা কবে
জীবন-মাঝে সহজ হবে ,
আপনি কবে তোমারি নাম
ধ্বনিবে সব কাজে ।

16

মেঘের পরে মেঘ জমেছে,
আঁধার করে আসে-
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।
কাজের দিনে নানা কাজে
থাকি নানা লোকের মাঝে,
আজ আমি যে বসে আছি
তোমারই আশ্বাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।

তুমি যদি না দেখা দাও
কর আমায় হেলা,
কেমন করে কাটে আমার
এমন বাদল-বেলা।
দূরের পানে মেলে আঁখি
কেবল আমি চেয়ে থাকি,
পরাণ আমার কেঁদে বেড়ায়
দুরন্ত বাতাসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।

17

কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো

উইকিসংকলন থেকে

কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো। রয়েছে দীপ, না আছে শিখা, এই কি ভালে ছিল রে লেখা- ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো। বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো।

বেদনাদূতী গাহিছে, ‘ওরে প্রাণ, তোমার লাগি জাগেন ভগবান। নিশীথে ঘন অন্ধকারে ডাকেন তোরে প্রেমাভিসারে,

দুঃখ দিয়ে রাখে তোর মান। তোমার লাগি জাগেন ভগবান।’

গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি, বদলজল পড়িছে ঝরি ঝরি। এ ঘোর রাতে কিসের লাগি পরান মম সহসা জাগি এমন কেন করছে মরি মরি। বাদলজল পড়িলে ঝরি ঝরি। বিজুলি শুধু ক্ষণিক আভা হানে, নিবিড়তর তিমির চোখে আনে। জানি না কোথা অনেক দূরে বাজিল গান গভীর সুরে, সকল প্রাণ টানিছে পথপানে। নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।

কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো। ডাকিছে মেঘ, হাকিছেঁ হাওয়া- সময় গেলে হবে না যাওয়া, নিবিড় নিশা নিকষ ঘন কালো। পরাণ দিয়ে প্রেমের দীপ জ্বালো।

18

আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে
গোপন তব চরণ ফেলে
নিশার মতো নীরব ওহে
সবার চিঠি এড়ায়ে এলে।
প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি,
বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি,
নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি
নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে।

কূজনহীন কাননভূমি,
দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে-
একেলা কোন পথিক তুমি
পথিকবিহীন পথের প’রে।
হে একা সখা, হে প্রিয়তম,
রয়েছে খোলা এ ঘর মম,
সমুখ দিয়ে স্বপনসম
হেয়ো না মোরে হেলায় ঠেলে।

19

আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল,
গেল রে দিন বয়ে ।
বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা
ঝরছে রয়ে রয়ে ।
একলা বসে ঘরের কোণে
কী ভাবি যে আপন-মনে,
সজল হাওয়া যূথীর বনে
কী কথা যায় কয়ে ।
বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা
ঝরছে রয়ে রয়ে ।

হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে,
খুঁজে না পাই কূল ;
সৌরভে প্রাণ কাঁদিয়ে তুলে
ভিজে বনের ফুল ।
আঁধার রাতে প্রহরগুলি
কোন্‌ সুরে আজ ভরিয়ে তুলি,
কোন্‌ ভুলে আজ সকল ভুলি
আছি আকুল হয়ে ।
বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা
ঝরছে রয়ে রয়ে ।

20

আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরানসখা বন্ধু হে আমার ।
আকাশ কাঁদে হতাশসম
নাই যে ঘুম নয়নে মম,
দুয়ার খুলি, হে প্রিয়তম,
চাই যে বারে বার ।
পরানসখা বন্ধু হে আমার ।

বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই,
তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই ।
সুদূর কোন্ নদীর পারে,
গহন কোন্ বনের ধারে,
গভীর কোন্ অন্ধকারে
হতেছ তুমি পার ।
পরানসখা বন্ধু হে আমার ।

22

তুমি কেমন করে গান কর যে, গুণী,
অবাক হয়ে শুনি কেবল শুনি।
সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,
সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,
পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে
বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।

মনে করি অমনি সুরে গাই,
কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।
কইতে কি চাই, কইতে কথা বাধে-
হার মেনে যে পরাণ আমার কাঁদে-
আমায় তুমি ফেলেছ কোন ফাঁদে
চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি।

23

অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না।
এবার হৃদয় মাঝে লুকিয়ে বোসো,
কেউ জানবে না, কেউ বলবে না।
বিশ্বে তোমার লুকোচুরি,
দেশ বিদেশে কতই ঘুরি –
এবার বলো আমার মনের কোণে
দেবে ধরা, ছলবে না।
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না।

জানি আমার কঠিন হৃদয়
চরণ রাখার যোগ্য সে নয় –
সখা, তোমার হাওয়া লাগলে হিয়ায়
তবু কি প্রাণ গলবে না।

না হয় আমার নাই সাধনা,
ঝরলে তোমার কৃপার কণা
তখন নিমেষে কি ফুটবে না ফুল
চকিতে ফল ফলবে না।
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না।

24

যদি তোমার দেখা না পাই, প্রভু,
এবার এ জীবনে
তবে তোমায় আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।

এ সংসারের হাটে
আমার যতই দিবস কাটে,
আমার যতই দু হাত ভরে ওঠে ধনে,
তবু কিছুই আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।

যদি অলস ভরে
আমি পথের পরে
যদি ধুলায় শয়ন পাতি সযতনে,
যেন সকল পথই বাকি আছে
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।

যতই উঠে হাসি,
ঘরে যতই বাজে বাঁশি,
ওগো, যতই গৃহ সাজাই আয়োজনে,
যেন তোমায় ঘরে হয় নি আনা
সে কথা রয় মনে।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।

26

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর
ভরা বাদরে ।
আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা
কোথাও না ধরে ।
শালের বনে থেকে থেকে
ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে,
জল ছুটে যায় এঁকেবেঁকে
মাঠের ‘পরে ।
আজ মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে
নৃত্য কে করে ।

ওরে বৃষ্টিতে মোর ছুটেছে মন,
লুটেছে ওই ঝড়ে,
বুক ছাপিয়ে তরঙ্গ মোর
কাহার পায়ে পড়ে ।
অন্তরে আজ কী কলরোল,
দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল,
হৃদয় মাঝে জাগল পাগল
আজি ভাদরে ।
আজ এমন করে কে মেতেছে
বাহিরে ঘরে ।

রচনাকাল: ১৪ ভাদ্র ১৩১৬
রবীন্দ্র রচনাবলী (বিশ্বভারতী ১৩৮৯) খণ্ড ১১, পৃ ২৫ থেকে সংগৃহীত ।

27

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর
ভরা বাদরে ।
আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা
কোথাও না ধরে ।
শালের বনে থেকে থেকে
ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে,
জল ছুটে যায় এঁকেবেঁকে
মাঠের ‘পরে ।
আজ মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে
নৃত্য কে করে ।

ওরে বৃষ্টিতে মোর ছুটেছে মন,
লুটেছে ওই ঝড়ে,
বুক ছাপিয়ে তরঙ্গ মোর
কাহার পায়ে পড়ে ।
অন্তরে আজ কী কলরোল,
দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল,
হৃদয় মাঝে জাগল পাগল
আজি ভাদরে ।
আজ এমন করে কে মেতেছে
বাহিরে ঘরে ।

রচনাকাল: ১৪ ভাদ্র ১৩১৬
রবীন্দ্র রচনাবলী (বিশ্বভারতী ১৩৮৯) খণ্ড ১১, পৃ ২৫ থেকে সংগৃহীত ।

30

এই-যে তোমার প্রেম, ওগো হৃদয়হরণ,
এই-যে পাতায় আলো নাচে সোনার বরন।।
এই-যে মধুর আলসভরে মেঘ ভেসে যায় আকাশ ’পরে,
এই-যে বাতাস দেহে করে অমৃতক্ষরণ।।
প্রভাত-আলোর ধারায় আমার নয়ন ভেসেছে।
এই তোমারি প্রেমের বাণী প্রাণে এসেছে।
তোমারি ওই মুখ নুয়েছে, মুখে আমার চোখ থুয়েছে,
আমার হৃদয় আজ ছুঁয়েছে তোমারি চরণ।।

31

আমি হেথায় থাকি শুধু
গাইতে তোমার গান,
দিয়ো তোমার জগত্সভায়
এইটুকু মোর স্থান |
আমি তোমার ভুবন-মাঝে
লাগি নি নাথ, কোনো কাজে,
শুধু কেবল সুরে বাজে
অকাজের এই প্রাণ |

নিশায় নীরব দেবালয়ে
তোমার আরাধন,
তখন মোরে আদেশ কোরো
গাইতে হে রাজন |
ভোরে যখন আকাশ জুড়ে
বাজবে বীণা সোনার সুরে
আমি যেন না রই দূরে
এই দিয়ো মোর মান |

রবীন্দ্র রচনাবলী (পশ্চিমবঙ্গ সরকার শতবার্ষিকী সং) খণ্ড ২, পৃ ২৩৪ থেকে সংগৃহীত| গীতবিতানে যতিচিহ্ণ (“লাগি নি, নাথ,”, “না রই দূরে,”) এবং পঙ্‌ক্তিবিন্যাস সামান্য আলাদা

32

দাও হে আমার ভয় ভেঙে দাও।
আমার দিকে ও মুখ ফিরাও।।
দকাছে থেকে চিনতে নারি, কোন্‌ দিকে যে কী নেহারি,
তুমি আমার হৃদ্‌বিহারী হৃদয়-পানে হাসিয়া চাও।।
বলো আমায় বলো কথা, গায়ে আমায় পরশ করো।
দক্ষিণ হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমায় তুমি তুলে ধরো।
যা বুঝি সব ভুল বুঝি হে, যা খুঁজি সব ভুল খুঁজি হে–
হাসি মিছে, কান্না মিছে, সামনে এসে এ ভুল ঘুচাও।।

33

আবার এরা ঘিরেছে মোর মন।
আবার চোখে নামে যে আবরণ ।।
আবার এ যে নানা কথাই জমে, চিত্ত আমার নানা দিকে ভ্রমে
দাহ আবার বেড়ে ওঠে ক্রমে, আবার এ যে হারাই শ্রীচরণ ।।
তব নীরব বাণী হৃদয়তলে
ডোবে না যেন লোকের কোলাহলে।
সবার মাঝে আমার সাথে থাকো, আমায় সদা তোমার মাঝে ঢাকো,
নিয়ত মোর চেতনা-‘পরে রাখো আলোকে-ভরা উদার ত্রিভুবন ।।

34

আমার মিলন লাগি তুমি
আসছ কবে থেকে।
তোমার চন্দ্র সূর্য তোমায়
রাখবে কোথায় ঢেকে।
কত কালের সকাল-সাঁঝে
তোমার চরণধ্বনি বাজে,
গোপনে দূত গৃহ-মাঝে
গেছে আমায় ডেকে।

ওগো পথিক, আজকে আমার
সকল পরাণ ব্যেপে
থেকে থেকে হরষ যেন
উঠছে কেঁপে কেঁপে
যেন সময় এসেছে আজ,
ফুরালো মোর যা ছিল কাজ –
বাতাস আসে, হে মহারাজ,
তোমার গন্ধ মেখে।

39

হেথা যে গান গাইতে আসা আমার
হয় নি সে গান গাওয়া-
আজও কেবলই সুর সাধা, আমার
কেবল গাইতে চাওয়া।

আমার লাগে নাই সে সুর, আমার
বাধেঁ নাই সে কথা-
শুধু প্রাণেরই মাঝখানে আছে
গানের ব্যাকুলতা।
আজও ফোটে নাই সে ফুল, শুধু
বহেছে এক হাওয়া।

আমি দেখি নাই তার মুখ, আমি
শুনি নাই তার বাণী-
কেবল শুনি ক্ষণে ক্ষণে তাহার
পায়ের ধ্বনিখানি।
আমার দ্বারের সমুখ দিয়ে সে জন
করে আসা যাওয়া।

শুধু আসন পাতা হল আমার
সারাটি দিন ধরে-
ঘরে হয় নি প্রদীপ জ্বালা, তারে
ডাকব কেমন করে।
আছি পাবার আশা নিয়ে, তারে
হয় নি আমার পাওয়া।

44

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন।
নয়ন আমার রূপের পুরে
সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে
হয়েছে মগন।

তোমার যজ্ঞে দিযেছ ভার
বাজাই আমি বাঁশি।
গানে গানে গেঁথে বেড়াই
প্রাণের কান্নাহাসি।
এখন সময় হয়েছে কি।
সভায় গিয়ে তোমায় দেখি
জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব
এ মোর নিবেদন।

45

আলোয় আলোকময় ক’রে হে
এলে আলোর আলো ।
আমার নয়ন হতে আঁধার
মিলালো মিলালো ।
সকল আকাশ সকল ধরা
আনন্দে হাসিতে ভরা,
যে দিক-পানে নয়ন মেলি
ভালো সবই ভালো ।

তোমার আলো গাছের পাতায়
নাচিয়ে তোলে প্রাণ ।
তোমার আলো পাখির বাসায়
জাগিয়ে তোলে গান ।
তোমার আলো ভালোবেসে
পড়েছে মোর গায়ে এসে,
হৃদয়ে মোর নির্মল হাত
বুলালো বুলালো ।

রচনা: বোলপুর ২০ অগ্রহায়ণ ১৩১৬
রবীন্দ্র রচনাবলী (বিশ্বভারতী ১৩৮৯) খণ্ড ১১, পৃ ৩৭ থেকে সংগৃহীত ।

47

রূপ-সাগরে ডুব দিয়েছি অরুপ-রতন আশা করি;
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী।
সময় যেন হয় রে এবার ঢেউ-খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার,
সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে অমর হয়ে রব মরি।

যে গান কানে যায় না শোনা সে গান যেথায় নিত্য বাজে
প্রাণের বীণা নিয়ে যাব সেই অতলের সভা-মাঝে।
চিরদিনের সুরটি বেঁধে শেষ গানে তার কান্না কেঁদে
নীরব যিনি তাঁহার পায়ে নীরব বীণা দিব ধরি।
রুপ-সাগরে ডুব দিয়েছি অরুপ-রতন আশা করি।।

49

আকাশতলে উঠল ফুটে
আলোর শতদল।
পাপড়িগুলি থরে থরে
ছড়ালো দিক্-দিগন্তরে,
ঢেকে গেলো অন্ধকারের
নিবিড় কালো জল।
মাঝখানেতে সোনার কোষে
আনন্দে, ভাই, আছি বসে –
আমায় ঘিরে ছড়ায় ধীরে
আলোর শতদল।

আকাশেতে ঢেউ দিয়ে রে
বাতাস বহে যায়।
চার দিকে গান বেজে ওঠে,
চার দিকে প্রাণ নেচে ছোটে,
গগনভরা পরশখানি
লাগে সকল গায়।
ডুব দিয়ে এই প্রাণ-সাগরে
নিতেছি প্রাণ বক্ষ ভরে,
ফিরে ফিরে আমায় ঘিরে
বাতাস বহে যায়।

দশ দিকেতে আঁচল পেতে
কোল দিয়েছে মাটি।
রয়েছে জীব যে যেখানে
সকলকে সে ডেকে আনে,
সবার হাতে সবার পাতে
অন্ন সে দেয় বাঁটি।
ভরেছে মন গীত গন্ধে,
বসে আছি মহানন্দে,
আমায় ঘিরে আঁচল পেতে
কোল দিয়েছে মাটি।

আলো, তোমায় নমি, আমার
মিলাক অপরাধ।
ললাটেতে রাখো আমার
পিতার আশীর্বাদ।
বাতাস, তোমায় নমি, আমার
ঘুচুক অবসাদ।
সকল দেহে বুলিয়ে দাও
পিতার আশীর্বাদ।
মাটি, তোমায় নমি, আমার
মিটুক সর্ব সাধ।
গৃহ ভরে ফলিয়ে তোলো
পিতার আশীর্বাদ।

55

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে।
আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,
আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,
এই সংগীতমুখরিত গগনে
তব গন্ধ করঙ্গিয়া তুলিয়ো।
এই বাহিরভূবনে দিশা হারায়ে
দিয়ো ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।

অতি নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে
আজি পল্লবে পল্লবে বাজে রে –
দূরে গগনে কাহার পথ চাহিয়া
আজি ব্যকুল বসুন্ধরা সাজে রে।
মোর পরানে দখিন বায়ু লাগিছে,
কারে দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে,
এই সৌরভবিহবল রজনী
কার চরণে ধরণীতলে জাগিছে।
ওগো সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,
তব গম্ভীর আহবান কারে।

58

জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো।
সকল মাধুরী লুকায়ে যায়, গীতসুধারসে এসো॥
কর্ম যখন প্রবল-আকার গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার
হৃদয়প্রান্তে, হে জীবননাথ, শান্ত চরণে এসো॥
আপনারে যবে করিয়া কৃপণ কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন
দুয়ার খুলিয়া, হে উদার নাথ, রাজসমারোহে এসো।
বাসনা যখন বিপুল ধুলায় অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায়,
ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র, রুদ্র আলোকে এসো॥

61

সে যে পাশে এসে বসেছিল

উইকিসংকলন থেকে

সে যে পাশে এসে বসেছিল, তবু জাগি নি। কী ঘুম তার পেয়েছিল, হতভাগিনী। এসেছিল নীরব রাতে, বীণাখানি ছিল হাতে, স্বপন মাঝে বাজিয়ে গেল গভীর রাগিনী।

জেগে দেখি দখিন হাওয়া পাগল করিয়া, গন্ধ তাহার ভেসে বেড়ায় আঁধার ভরিয়া। কেন আমার রজনী যায়, কাছে পেয়ে কাছে না পায়, কেন গো তার মালার পরশ বুকে লাগে নি।

68

আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে
তখন কে তুমি তা কে জানত।
তখন ছিল না ভয়, ছিল না লাজ মনে,
জীবন বহে যেত অশান্ত।
তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত
যেন আমার আপন সখার মতো,
হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলাম ছুটে
সেদিন কত-না বন-বনান্ত।

ওগো, সেদিন তুমি গাইতে যে সব গান
কোনো অর্থ তাহার কে জানত।
শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,
সদা নাচত হৃদয় অশান্ত।
হঠাৎ খেলার শেষে আজ কী দেখি ছবি –
স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,
তোমার চরণপানে নয়ন করি নত
ভুবন দাঁড়িয়ে গেছে একান্ত।

71

ওগো মৌন, না যদি কও
নাই কহিলে কথা।
বক্ষ ভরি বইব আমি
তোমার নীরবতা।
স্তব্ধ হয়ে রইব পড়ে
রজনী রয় যেমন করে
জ্বালিয়ে তারা নিমেষহারা
ধৈর্যে অবনতা।

হবে হবে প্রভাত হবে,
আঁধার যাবে কেটে।
তোমার বাণী সোনার ধারা
পড়বে আকাশ ফেটে।
তখন আমার পাখির বাসায়
জাগবে কি গান তোমার ভাষায়।
তোমার তানে ফোটাবে ফুল
আমার বনলতা?

78
তুমি যখন গান গাহিতে বল
গর্ব আমার ভ’রে উঠে বুকে;
দুই আঁখি মোর করে ছলছল,
নিমেষহারা চেয়ে তোমার মুখে।

কঠিন কটু যা আছে মোর প্রাণে
গলিতে চায় অমৃতময় গানে,
সব সাধনা আরাধনা মম
উড়িতে চায় পাখির মত সুখে।

তৃপ্ত তুমি আমার গীতরাগে,
ভালো লাগে তোমার ভালো লাগে,
জানি আমি এই গানেরই বলে
বসি গিয়ে তোমারি সম্মুখে।

মন দিয়ে যার নাগাল নাহি পাই,
গান দিয়ে সেই চরণ ছুঁয়ে যাই,
সুরের ঘোরে আপনাকে যাই ভুলে,
বন্ধু ব’লে ডাকি মোর প্রভুকে।

83

কথা ছিল এক তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে,
ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী
কোথায়, যেতেছি কোন দেশে সে কোন দেশে।
কূলহারা সেই সমুদ্র-মাঝখানে
শোনাবো গান একলা তোমার কানে,
ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন-হারা
আমার সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে ।।

আজও সময় হয় নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি –
ওগো, ওই-যে ‌সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।
মলিন আলোয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখি
আপন কুলায়-মাঝে সবাই এল ফিরে।

কখন তুমি আসবে ঘাটের ‘পরে
বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে।
অস্তরবির শেষ আলোটির মতো
তরী নিশীথ-মাঝে যাবে নিরুদ্দেশে ।।

86
আমারে যদি জাগালে আজি, নাথ,
ফিরো না তবে ফিরো না, করো
করুণ আঁখিপাত ।
নিবিড় বন-শাখার ‘পরে
আষাঢ়-মেঘে বৃষ্টি ঝরে,
বাদলভরা আলসভরে
ঘুমায়ে আছে রাত ।
ফিরো না তুমি ফিরো না, করো
করুণ আঁখিপাত ।

বিরামহীন বিজুলিঘাতে
নিদ্রাহারা প্রাণ
বরষা-জলধারার সাথে
গাহিতে চাহে গান ।
হৃদয় মোর চোখের জলে
বাহির হল তিমিরতলে,
আকাশ খোঁজে ব্যাকুল বলে
বাড়ায়ে দুই হাত ।
ফিরো না তুমি ফিরো না, করো
করুণ আঁখিপাত ।

90

আরো আঘাত সইবে আমার
সইবে আমারো,
আরো কঠিন সুরে জীবনতারে ঝংকারো ।
যে রাগ জাগাও আমার প্রাণে
বাজে নি তা চরমতানে,
নিঠুর মূর্ছনায় সে গানে
মূর্তি সঞ্চারো ।

লাগে না গো কেবল যেন
কোমল করুণা,
মৃদু সুরের খেলায় এ প্রাণ
ব্যর্থ কোরো না ।
জ্বলে উঠুক সকল হুতাশ,
গর্জি উঠুক সকল বাতাস,
জাগিয়ে দিয়ে সকল আকাশ
পূর্ণতা বিস্তারো ।

92

দেবতা জেনে দূরে রই দাঁড়ায়ে,
আপন জেনে আদর করি নে।
পিতা ব’লে প্রণাম করি পায়ে,
বন্ধু ব’লে দু হাত ধরি নে।।
আপনি তুমি অতি সহজ প্রেমে
আমার হয়ে যেথায় এলে নেমে
সেথায় সুখে বুকের মধ্যে ধ’রে সঙ্গী বলে তোমায় বরি নে।।
ভাই তুমি যে ভাইয়ের মাঝে, প্রভু ,
তাদের পানে তাকাই না যে তবু–
ভাইয়ের সাথে ভাগ ক’রে মোর ধন তোমার মুঠো কেন ভরি নে।।
ছুটে এসে সবার সুখে দুখে
দাঁড়াই নে তো তোমারি সম্মুখে,
সঁপিঁয়ে প্রাণ ক্লান্তিবিহীন কাজে প্রাণসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ি নে।।

101

হে মোর দেবতা, ভরিয়া এ দেহপ্রাণ
কী অমৃত তুমি চাহ করিবারে পান !
আমার নয়নে তোমার বিশ্বছবি
দেখিয়া লইতে সাধ যায় তব কবি –
আমার মুগ্ধ শ্রবণে নীরব রহি
শুনিয়া লইতে চাহ আপনার গান ।।

আমার চিত্তে তোমার সৃষ্টিখানি
রচিয়া তুলিছে বিচিত্র এক বাণী।
তারি সাথে, প্রভু, মিলিয়া তোমার প্রীতি
জাগায়ে তুলিছে আমার সকল গীতি –
আপনারে তুমি দেখিছ মধুর রসে
আমার মাঝারে নিজেরে করিয়া দান ।।

104

আমি চেয়ে আছি তোমাদের সবা-পানে ।
স্থান দাও মোরে সকলের মাঝখানে ।
নীচে সব-নীচে এ ধূলির ধরণীতে
যেথা আসনের মূল্য না হয় দিতে,
যেথা রেখা দিয়ে ভাগ করা নেই কিছু,
যেথা ভেদ নাই মানে আর অপমানে ।
স্থান দাও সেথা সকলের মাঝখানে ।

যেথা বাহিরের আবরণ নাহি রয়,
যেথা আপনার উলঙ্গ পরিচয় ।
আমার বলিয়া কিছু নাই একেবারে
এ সত্য যেথা নাহি ঢাকে আপনারে,
সেথায় দাঁড়ায়ে নিলাজ দৈন্য মম
ভরিয়া লইব তাঁহার পরম দানে ।
স্থান দাও মোরে সকলের মাঝখানে ।

104

আর আমায় আমি নিজের শিরে
বইব না ।
আর নিজের দ্বারে কাঙাল হয়ে
রইব না ।
এই বোঝা তোমার পায়ে ফেলে
বেড়িয়ে পড়ব অবহেলে–
কোনো খবর রাখব না ওর,
কোনো কথাই কইব না ।
আমায় আমি নিজের শিরে
বইব না ।

বাসনা মোর যারেই পরশ
করে সে
আলোটি তার নিবিয়ে ফেলে
নিমেষে ।
ওর সেই অশুচি দুই হাতে তার
যা এনেছে চাই নে সে আর,
তোমার প্রেমে বাজবে যা
সে আর আমি সইব না ।
আমায় আমি নিজের শিরে
বইব না ।

107

যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেই খানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে, সবার নিচে,
সব- হারাদের মাঝে।
যখন তোমায় প্রণাম করি আমি
প্রণাম আমার কোনখানে যায় থামি-
তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে
সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে
সবার পিছে, সবার নিচে,
সব- হারাদের মাঝে।

অহংকার তো পায় না নাগাল যেথায় তুমি ফের
রিক্তভূষণ দীনদরিদ্র সাজে
সবার পিছে, সবার নিচে,
সব- হারাদের মাঝে।
ধনে মানে যেথায় আছে ভরি
সেথায় তোমার সঙ্গ আশা করি-
সঙ্গী হয়ে আছ যেথায় সঙ্গীহীনের ঘরে
সেথায় আমার হৃদয় নামে না যে
সবার পিছে, সবার নিচে,
সব- হারাদের মাঝে।

119

ভজন পূজন সাধন আরাধনা
সমস্ত থাক পড়ে।
রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে
কেন আছিস ওরে।
অন্ধকারে লুকিয়ে আপন-মনে
কাহারে তুই পূজিস সংগোপনে,
নয়ন মেলে দেখ দেখি তুই চেয়ে-
দেবতা নাই ঘরে।

তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে
করছে চাষা চাষ-
পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,
খাটছে বার মাস।
রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,
ধুলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে-
তাঁরই মতন শুচি বসন ছাড়ি
আয় রে ধুলার পরে।
মুক্তি? ওরে, মুক্তি কোথায় পাবি,
মুক্তি কোথায় আছে।
আপনি প্রভূ সৃষ্টিবাঁধন প’রে
বাঁধা সবার কাছে।
রাখো রে ধ্যান, থাক রে, ফুলের ডালি,
ছিঁড়ুক বস্ত্র, লাগুক ধুলাবালি-
কর্মযোগে তাঁর সাথে এক হয়ে
ঘর্ম পড়ুক ঝরে।

121

তাই তোমার আনন্দ আমার ‘পর,
তুমি তাই এসেছ নীচে–
আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর,
তোমার প্রেম যে হত মিছে ।
আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা,
আমার হিয়ায় চলছে রসের খেলা,
মোর জীবনের বিচিত্ররূপ ধ’রে
তোমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে ।

তাই তো তুমি রাজার রাজা হয়ে
তবু আমার হৃদয় লাগি
ফিরছ কত মনোহরণ বেশে–
প্রভু, নিত্য আছ জাগি ।
তাই তো, প্রভু, হেথায় এল নেমে
তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে,
মূর্তি তোমার যুগলসম্মিলনে
সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে ।

125

আমার এ গান ছেড়েছে তার
সকল অলংকার
তোমার কাছে রাখে নি আর
সাজের অহংকার।
অলংকার যে মাঝে প’ড়ে
মিলনেতে আড়াল করে,
তোমার কথা ঢাকে যে তার
মুখর ঝংকার।

তোমার কাছে খাটে না মোর
কবির গরব করা-
মহাকবি, তোমার পায়ে
দিতে চাই যে ধরা।
জীবন লয়ে যতন করি
যদি সরল বাঁশি গড়ি,
আপন সুরে দিবে ভরি
সকল ছিদ্র তার।

127

রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে,
পরাও যারে মণিরতন-হার –
খেলাধুলা আনন্দ তার সকলই যায় ঘুরে,
বসন-ভূষণ হয় যে ভীষণ ভার।
ছেঁড়ে পাছে আঘাত লাগি,
পাছে ধুলায় হয় সে দাগি,
আপনাকে তাই সরিয়ে রাখে সবার হতে দূরে,
চলতে গেলে ভাবনা ধরে তার-
রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে,
পরাও যারে মণিরতন-হার।

কি হবে, মা অমন-তরো রাজার মতো সাজে,
কি হবে ওই মণিরতন-হারে-
দুয়ার খুলে দাও যদি তো ছুটি পথের মাঝে
রৌদ্রবায়ু- ধুলাকাদার পাড়ে।
সেথায় বিশ্বজনের মেলা,
সমস্ত দিন নানান খেলা,
চারিদিকে বিরাট গাথা বাজে হাজার সুরে,
সেথায় সে যে পায় না অধিকার-
রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে,
পরাও যারে মণিরতন-হার।

130

আমার মাঝে তোমার লীলা হবে,
তাই তো আমি এসেছি এই ভবে ।
এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার,
ঘুচে যাবে সকল অহংকার,
আনন্দময় তোমার এ সংসারে
আমার কিছু আর বাকি না রবে ।

মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে
আমার মাঝে তোমার লীলা হবে ।
সব বাসনা যাবে আমার থেমে
মিলে গিয়ে তোমারি এক প্রেমে,
দুঃখসুখের বিচিত্র জীবনে
তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে ।

142

যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই –
যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে
তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।
যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।

বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই গেলেম খেলে,
অপরূপকে দেখে গেলেম দুটি নয়ন মেলে।
পরশ যাঁরে যায় না করা সকল দেহে দিলেন ধরা,
এইখানে শেষ করেন যদি শেষ করে দিন তাই –
যাবার বেলা এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।

145

জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই-
ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে ।
মুক্তি চাহিবারে তোমার কাছে যাই,
চাহিতে গেলে মরি লাজে ।।
জানি হে তুমি মম জীবনে শ্রেয়তম,
এমন ধন আর নাহি যে তোমা-সম,
তবু যা ভাঙাচোরা ঘরেতে আছে পোরা
ফেলিয়া দিতে পারি না যে ।।
তোমারে আবরিয়া ধুলাতে ঢাকে হিয়া,
মরণ আনে রাশি রাশি-
আমি যে প্রাণ ভরি তাদের ঘৃণা করি
তবুও তাই ভালোবাসি ।
এতই আছে বাকি, জমেছে এত ফাঁকি,
কত যে বিফলতা, কত যে ঢাকাঢাকি,
আমার ভালো তাই চাহিতে যবে যাই
ভয় যে আসে মনোমাঝে ।।

147

জীবনে যত পূজা হল না সারা,
জানি হে, জানি তাও হয় নি হারা।
যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে,
যে নদী মরুপথে হারালো ধারা,
জানি হে, জানি তাও হয় নি হারা।।

জীবনে আজও যাহা রয়েছে পিছে,
জানি হে, জানি তাও হয় নি মিছে।
আমার অনাগত আমার অনাহত
তোমার বীণাতারে বাজিছে তারা –
জানি হে, জানি তাও হয় নি হারা ।।

148

একটি নমস্কারে, প্রভু,
একটি নমস্কারে
সকল দেহ লুটিয়ে পড়ুক
তোমার এ সংসারে।

ঘন শ্রাবণ-মেঘের মতো
রসের ভারে নম্র নত
একটি নমস্কারে, প্রভু,
একটি নমস্কারে
সমস্ত মন পড়িয়া থাক্
তব ভবন-দ্বারে।

নানা সুরের আকুল ধারা
মিলিয়ে দিয়ে আত্মহারা
একটি নমস্কারে, প্রভু,
একটি নমস্কারে
সমস্ত গান সমাপ্ত হোক
নীরব পারাবারে।

হংস যেমন মানসযাত্রী,
তেমনি সারা দিবসরাত্রি
একটি নমস্কারে, প্রভু,
একটি নমস্কারে
সমস্ত প্রাণ উড়ে চলুক
মহামরণ-পারে ।

রচনাকাল: ২৩ শ্রাবণ ১৩১৭
রবীন্দ্র রচনাবলী (পশ্চিমবঙ্গ সরকার শতবার্ষিকী সং) খণ্ড ২, পৃ ৩০৮ থেকে সংগৃহীত ।

151

প্রেমের হাতে ধরা দিব
তাই রয়েছি বসে;
অনেক দেরি হয়ে গেল
দোষী অনেক দোষে।
বিধিরবিধান-বাঁধন-ডোরে
ধরতে আসে, যাই যে সরে-
তার লাগি যা শাস্তি নেবার
নেব মনের তোষে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে।

লোকে আমায় নিন্দা করে,
নিন্দা সে নয় মিছে-
সকল নিন্দা মাথায় ধরে
রব সবার নিচে।
শেষ হয়ে যে গেল বেলা,
ভাঙল বেচা-কেনার মেলা-
ডাকতে যারা এসেছিল
ফিরল তারা রোষে।
প্রেমের হাতে ধরা দেব
তাই রয়েছি বসে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: